ই-পাসপোর্টের কাগজপত্র নিয়ে সবচেয়ে বড় বিভ্রান্তি হলো, একটি মাত্র তালিকা ধরে সবাই প্রস্তুতি নেন। অথচ আবেদনকারীর বয়স ও ক্ষেত্র অনুযায়ী কাগজপত্র বদলে যায় — প্রাপ্তবয়স্কের জন্য যা বাধ্যতামূলক, শিশুর ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্যই নয়; আবার শিশুর জন্য যেটা লাগবে, প্রাপ্তবয়স্কের তালিকায় সেটার উল্লেখই থাকে না। এই অমিলের কারণেই পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে অনেককে ফিরে আসতে হয়: কারো বাবা-মায়ের এনআইডির কপি নেই, কারো আগের পাসপোর্টের ফটোকপি নেই, কেউ আবার এমন কাগজ নিয়ে হাজির হন যেটা আদৌ লাগে না। এই লেখায় ক্ষেত্রভেদে ভাগ করে পূর্ণ তালিকা দেওয়া হলো, যাতে একবারেই সঠিক প্রস্তুতি নেওয়া যায়। আবেদনের পুরো প্রক্রিয়াটা ধাপে ধাপে জানতে পড়ুন ই-পাসপোর্ট করার নিয়ম নির্দেশিকাটি।
এই লেখায় যা যা আছে
- মূল নিয়ম — কোন পরিচয়পত্রের ভিত্তিতে আবেদন হবে
- প্রাপ্তবয়স্কদের (১৮ বছর বা তার বেশি) কাগজপত্র
- ১৮ বছরের কম বয়সীদের কাগজপত্র
- ৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের বাড়তি নিয়ম
- পেশা অনুযায়ী বাড়তি কাগজপত্র
- ঠিকানার প্রমাণ কখন লাগে
- আগের পাসপোর্ট থাকলে যা লাগবে
- বায়োমেট্রিকের দিন সঙ্গে নেওয়ার চেকলিস্ট
- ক্ষেত্রভেদে কাগজপত্র এক নজরে — টেবিল
- যেসব কাগজ আসলে লাগে না
- সচরাচর জিজ্ঞাসা
মূল নিয়ম — পরিচয় প্রমাণই সবকিছুর ভিত্তি
ই-পাসপোর্ট আবেদনের ভিত্তি একটি মাত্র পরিচয় নথি। বয়স ১৮ বছর বা তার বেশি হলে সেই ভিত্তি হলো জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি); বয়স ১৮ বছরের কম হলে অনলাইনে যাচাইযোগ্য জন্ম নিবন্ধন সনদ। অনলাইন ফরমে যে তথ্য দেবেন, তা এই নথির সঙ্গে হুবহু মিলতে হবে — নামের বানান, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের নামের একটি অক্ষরের অমিলও পরে বড় জটিলতা তৈরি করে, কারণ পাসপোর্টের তথ্য এই নথি থেকেই যাচাই হয়। এনআইডিতে নিজেরই ভুল থাকলে আগে সেটি সংশোধন করে নেওয়াই সঠিক পথ; সংশোধনের ধাপ ও কাগজপত্র নিয়ে বিস্তারিত আছে এনআইডি সংশোধনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের লেখায়।
একটি স্বস্তির তথ্য: অনলাইন ফরম পূরণের সময় কোনো কাগজপত্র আপলোড বা সত্যায়িত (অ্যাটেস্টেড) কপি জমা দিতে হয় না। ফরমে শুধু তথ্য দিতে হয়; মূল কাগজপত্র দেখাতে হয় বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্টের দিন পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে। অর্থাৎ আবেদনের ধাপটি পুরোপুরি ঘরে বসে করা যায়, কাগজপত্রের ঝামেলা শুধু এক দিনের — অফিসে যাওয়ার দিনের।
প্রাপ্তবয়স্কদের কাগজপত্র (১৮ বছর বা তার বেশি)
প্রাপ্তবয়স্ক আবেদনকারীর জন্য তালিকাটি ছোট ও নির্দিষ্ট:
- জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) — মূল কপি ও একটি ফটোকপি। স্মার্ট কার্ড না থাকলে এনআইডির অনলাইন কপি দিয়েও আবেদন করা যায়, তবে অফিসে যাওয়ার সময় যেটি আছে সেটির মূল কপি সঙ্গে নিন।
- আগের পাসপোর্ট (যদি থাকে) — মূল পাসপোর্ট ও তথ্যের পৃষ্ঠাগুলোর ফটোকপি। নবায়নের ক্ষেত্রে এটি বাধ্যতামূলক; বিস্তারিত পাসপোর্ট নবায়নের নিয়মে দেওয়া আছে।
- অনলাইন আবেদনের প্রিন্ট কপি — সাবমিট করা ফরমের প্রিন্ট (বারকোডসহ আবেদনপত্র ও Application Summary)।
- ফি জমার রশিদ — অনলাইনে পরিশোধ করলে পেমেন্ট রিসিপ্ট, ব্যাংকে জমা দিলে এ-চালানের কপি।
- অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লিপ — পোর্টাল থেকে পাওয়া নির্ধারিত তারিখের স্লিপ, যেসব অফিসে অ্যাপয়েন্টমেন্ট চালু আছে।
খেয়াল রাখুন, প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে জন্ম নিবন্ধন সনদ সাধারণত চাওয়া হয় না — এনআইডিই যথেষ্ট। তবে ফরমে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে এনআইডির তথ্য মিলিয়ে দেখার দায়িত্ব আপনার; অমিল ধরা পড়লে এনরোলমেন্ট আটকে যেতে পারে। নাম বা জন্মতারিখে পাসপোর্ট ও এনআইডির মধ্যে আগের থেকেই গরমিল থাকলে করণীয় জানতে পড়ুন পাসপোর্ট তথ্য সংশোধনের লেখাটি।
১৮ বছরের কম বয়সীদের কাগজপত্র
অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে পরিচয়ের ভিত্তি বদলে যায়, তালিকায় যোগ হয় বাবা-মায়ের নথি:
- অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ — ১৭ ডিজিটের, অনলাইনে যাচাইযোগ্য (BDRIS) নিবন্ধন নম্বরসহ। পুরনো হাতে লেখা সনদ দিয়ে আবেদন করা যায় না; সনদ অনলাইনে না থাকলে আগে নিবন্ধনটি অনলাইন করে নিতে হয়।
- বাবা ও মায়ের এনআইডি — উভয়ের এনআইডির ফটোকপি। ফরমে বাবা-মায়ের নাম ও তথ্য এই এনআইডি অনুযায়ী দিতে হয়।
- অভিভাবকের উপস্থিতি — বায়োমেট্রিকের দিন বাবা-মা অথবা আইনি অভিভাবককে সঙ্গে থাকতে হতে পারে; অফিস অনুযায়ী এ নিয়মে কিছুটা তারতম্য দেখা যায়।
মনে রাখার বিষয়: ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য শুধু ৪৮ পৃষ্ঠার ৫ বছর মেয়াদি পাসপোর্টই পাওয়া যায় — ১০ বছর মেয়াদ বা ৬৪ পৃষ্ঠার বই তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়। কোন বইয়ে কত ফি, তা জানা থাকলে বাজেট পরিকল্পনা সহজ হয় — পুরো তালিকা আছে ই-পাসপোর্ট ফি-র লেখায়।
৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের বাড়তি নিয়ম
ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে একটি ব্যতিক্রম আছে, যা অন্য কোনো তালিকায় সাধারণত চোখে পড়ে না। বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্টের সময় অফিসের ক্যামেরায় ছবি তোলা হলেও, ৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত ধূসর (গ্রে) ব্যাকগ্রাউন্ডে ল্যাব থেকে প্রিন্ট করা 3R সাইজের ছবি দুই কপি সঙ্গে নিতে বলা হয়। শিশুর ছবি অফিসের আসনে বসে তোলা কঠিন বলেই এই ব্যবস্থা। শিশুর পাসপোর্ট করতে যাওয়ার আগের দিন ছবি দুটি তৈরি করে রাখুন, আর জন্ম নিবন্ধন ও বাবা-মায়ের এনআইডির কপি তো লাগছেই। শিশুদের ক্ষেত্রে আঙুলের ছাপ ও আইরিস স্ক্যানের নিয়ম বয়স অনুযায়ী শিথিল থাকে — এই অংশটি এনরোলমেন্ট কর্মকর্তাই পরিচালনা করেন, আপনার আলাদা প্রস্তুতির কিছু নেই।
পেশা অনুযায়ী বাড়তি কাগজপত্র
ফরমে যে পেশা উল্লেখ করবেন, তার প্রমাণ চাওয়া হতে পারে। যেসব ক্ষেত্রে বাড়তি কাগজ প্রায় নিয়মিত লাগে:
- সরকারি চাকরিজীবী — দপ্তর থেকে নেওয়া অনাপত্তিপত্র (NOC) অথবা সরকারি আদেশ (GO)। সরকারি পাসপোর্ট (অফিসিয়াল) নিলে GO বাধ্যতামূলক; সাধারণ পাসপোর্ট নিলেও কর্মস্থলের NOC চাওয়া হতে পারে।
- শিক্ষার্থী — শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচয়পত্র বা প্রত্যয়নপত্রের কপি।
- বেসরকারি চাকরিজীবী — সাধারণত আলাদা প্রমাণ লাগে না, তবে অফিস চাইলে কর্মস্থলের পরিচয়পত্র দেখাতে হতে পারে।
- অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা — পেনশন বা অবসরের প্রমাণপত্র (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)।
এই বাড়তি কাগজগুলো প্রতিটি অফিসে একই কঠোরতায় যাচাই হয় না, তবে না থাকলে ফিরে আসার ঝুঁকি থাকে। পেশার প্রমাণ সঙ্গে রাখাটাই নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
ঠিকানার প্রমাণ কখন লাগে
বর্তমান ঠিকানা এনআইডির ঠিকানার সঙ্গে মিলে গেলে ঠিকানার আলাদা প্রমাণ সাধারণত লাগে না। সমস্যা হয় তখনই, যখন আপনি এনআইডির ঠিকানা থেকে ভিন্ন এলাকায় বসবাস করে সেই ঠিকানায় আবেদন করেন — এক্ষেত্রে বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ বিল, পানি বিল বা অনুরূপ নথির কপি চাওয়া হতে পারে। ভাড়া বাসায় থাকলে বাড়িওয়ালার তথ্যসহ বিলের কপি সঙ্গে রাখুন। স্থায়ী ও বর্তমান — দুই ঠিকানাই ফরমে সঠিকভাবে দেওয়া জরুরি, কারণ ডেলিভারি ও যাবতীয় যাচাই এই ঠিকানার ভিত্তিতেই হয়।
বায়োমেট্রিকের দিন সঙ্গে নেওয়ার চেকলিস্ট
অফিসে যাওয়ার আগের রাতে এই তালিকা ধরে ফোল্ডার গুছিয়ে নিন:
- অনলাইন আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি ও Application Summary
- অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লিপ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
- ফি পরিশোধের রশিদ বা এ-চালান
- এনআইডির মূল কপি ও এক সেট ফটোকপি (অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে জন্ম নিবন্ধন ও বাবা-মায়ের এনআইডির কপি)
- আগের পাসপোর্টের মূল কপি ও ডেটা পেজের ফটোকপি (যদি থাকে)
- পেশা বা ঠিকানার বাড়তি প্রমাণ (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে)
- ৬ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে 3R সাইজের ছবি দুই কপি
ক্ষেত্রভেদে কাগজপত্র এক নজরে
| আবেদনকারীর ক্ষেত্র | প্রধান পরিচয় নথি | বাড়তি যা লাগে |
|---|---|---|
| প্রাপ্তবয়স্ক, প্রথম পাসপোর্ট | এনআইডি | পেশার প্রমাণ (প্রযোজ্য হলে), ঠিকানার প্রমাণ (ঠিকানা ভিন্ন হলে) |
| ১৮ বছরের কম | অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ | বাবা-মায়ের এনআইডির কপি, অভিভাবকের উপস্থিতি |
| ৬ বছরের কম | অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ | বাবা-মায়ের এনআইডির কপি, 3R ছবি দুই কপি |
| সরকারি চাকরিজীবী | এনআইডি | NOC অথবা GO |
| নবায়ন / রি-ইস্যু | এনআইডি | আগের পাসপোর্ট (মূল ও ফটোকপি) |
যেসব কাগজ আসলে লাগে না
কয়েকটি ভুল ধারণা অনেকের অযথা খরচ ও ছুটোছুটির কারণ হয়। প্রথমত, প্রাপ্তবয়স্কদের নিজের ছবি তুলে নিয়ে যেতে হয় না — ছবি অফিসেই এনরোলমেন্টের সময় তোলা হয়। দ্বিতীয়ত, অনলাইন আবেদনে সত্যায়িত ফটোকপির কোনো ভূমিকা নেই; সত্যায়ন করাতে গিয়ে টাকা খরচ করার প্রয়োজন নেই। তৃতীয়ত, চারিত্রিক সনদ বা চেয়ারম্যান সার্টিফিকেট পাসপোর্ট আবেদনে লাগে না। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ — কোনো দালাল বা এজেন্টের মাধ্যমে কাগজ "ম্যানেজ" করার দরকার নেই; প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি নিজে করার মতো করেই সাজানো।
১৮ থেকে ২০ বছর বয়সীদের বিশেষ সুযোগ
একটি কম পরিচিত নিয়ম আছে বয়সের এই সন্ধিক্ষণের জন্য। পোর্টালের নির্দেশনা অনুযায়ী, ১৮ থেকে ২০ বছর বয়সী আবেদনকারীরা এনআইডি অথবা ১৭ ডিজিটের অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ — যেকোনো একটি দিয়েই আবেদন করতে পারেন। যাঁদের বয়স সদ্য ১৮ পেরিয়েছে কিন্তু এনআইডি এখনো হাতে পাননি, তাঁদের জন্য এই সুযোগটি পাসপোর্টের অপেক্ষা কমিয়ে দেয়। তবে মনে রাখতে হবে, যে নথি দিয়েই আবেদন করুন, সেটির তথ্যই পাসপোর্টে প্রতিফলিত হবে — পরে এনআইডি হাতে পেয়ে দুই নথির মধ্যে অমিল দেখলে সংশোধনের ঝামেলা পোহাতে হবে। তাই সম্ভব হলে এনআইডি দিয়েই আবেদন করা দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ।
বিবাহিত আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে
ফরমে স্বামী বা স্ত্রীর নাম ও তথ্য দেওয়ার ঘর থাকে। সাধারণ আবেদনে কাবিননামা বা বিবাহ সনদ জমা দিতে হয় না। তবে বিয়ের পর নামের সঙ্গে স্বামীর নামের অংশ যোগ করা কিংবা বৈবাহিক অবস্থা সংক্রান্ত তথ্য পুরনো পাসপোর্ট থেকে বদলাতে চাইলে সংশ্লিষ্ট প্রমাণ চাওয়া হতে পারে। এমন পরিবর্তনের ক্ষেত্রে আবেদনের আগেই পাসপোর্ট অফিস থেকে জেনে নেওয়া ভালো কোন নথি লাগবে — কারণ এটি তখন শুধু নতুন আবেদন নয়, তথ্য পরিবর্তনের বিষয়ও বটে।
প্রবাসীদের ক্ষেত্রে কাগজপত্র
বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরা সংশ্লিষ্ট দেশের বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেটে আবেদন করেন। মূল কাঠামো একই — অনলাইন ফরম, এনআইডি বা জন্ম নিবন্ধন — তবে মিশনভেদে বাড়তি কাগজ চাওয়া হতে পারে, যেমন সেই দেশের রেসিডেন্স পারমিট বা ওয়ার্ক পারমিটের কপি, ক্ষেত্রবিশেষে নিয়োগকর্তার তথ্য। প্রতিটি মিশনের ওয়েবসাইটে নিজস্ব চেকলিস্ট দেওয়া থাকে; আবেদনের আগে সেটি দেখে নেওয়াই নিয়ম, কারণ দেশভেদে তালিকা বদলায়।
কাগজপত্রে ঘাটতি থাকলে সেদিন যা ঘটে
বায়োমেট্রিকের দিন কোনো জরুরি কাগজ না থাকলে সাধারণত এনরোলমেন্ট সম্পন্ন হয় না — আবেদনটি অপেক্ষমাণ রেখে কাগজ নিয়ে আবার আসতে বলা হয়, প্রয়োজনে নতুন অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়। ফি বা আবেদন বাতিল হয়ে যায় না, কিন্তু সময় নষ্ট হয় এবং ব্যস্ত অফিসে নতুন তারিখ পেতে দেরি হতে পারে। এই কারণেই এই লেখার চেকলিস্ট ধরে আগের রাতে ফোল্ডার গোছানো এত গুরুত্বপূর্ণ — পাঁচ মিনিটের যাচাই একদিনের ছুটোছুটি বাঁচিয়ে দেয়।
তিনজন আবেদনকারীর উদাহরণ — কার প্যাকেটে কী থাকবে
বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, বয়স ২১, প্রথম পাসপোর্ট: এনআইডি (মূল ও ফটোকপি), ছাত্র পরিচয়পত্রের কপি, আবেদনের প্রিন্ট কপি, অ্যাপয়েন্টমেন্ট স্লিপ ও ফি-র রশিদ। জন্ম নিবন্ধন বা বাবা-মায়ের এনআইডি তার লাগবে না — প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে তার নিজের এনআইডিই যথেষ্ট।
প্রবাসগামী কর্মী, বয়স ৩০, আগের এমআরপি পাসপোর্ট আছে: এনআইডি, পুরনো এমআরপি বই (মূল ও ডেটা পেজের ফটোকপি), আবেদনের প্রিন্ট, ফি-র রশিদ। তার ক্ষেত্রে পুরনো বইটি শুধু কাগজ নয় — নতুন আবেদনের তথ্য পুরনো বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে যাচাই হবে, তাই নাম বা জন্মতারিখে অমিল থাকলে আগেই সংশোধনের নিয়ম জেনে নেওয়া জরুরি।
শিশু, বয়স ৪, প্রথম পাসপোর্ট: অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ, বাবা ও মায়ের এনআইডির কপি, ল্যাব-প্রিন্ট 3R ছবি দুই কপি, আবেদনের প্রিন্ট ও ফি-র রশিদ। শিশুকে সঙ্গে নিয়ে বাবা-মা বা অভিভাবককেই অফিসে যেতে হবে। তিনটি উদাহরণ পাশাপাশি রাখলেই বোঝা যায়, একটি সার্বজনীন তালিকা কেন সবার কাজে লাগে না — বয়স ও ইতিহাস অনুযায়ী প্যাকেট বদলে যায়।
কাগজ যাচাইয়ের সময় অফিসে যা দেখা হয়
এনরোলমেন্টের আগে যাচাইকারী কর্মকর্তা তিনটি জিনিস পাশাপাশি মেলান: অনলাইন ফরমে দেওয়া তথ্য, মূল পরিচয় নথি এবং তার ফটোকপি। নামের বানান, জন্মতারিখ ও বাবা-মায়ের নাম — এই তিনটি ক্ষেত্রে যেকোনো একটির অমিল পেলেই প্রক্রিয়া থামিয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। শিশুদের ক্ষেত্রে বাড়তি যাচাই হয় বাবা-মায়ের এনআইডির সঙ্গে জন্ম নিবন্ধনে লেখা নামের মিল — অনেক পুরনো জন্ম নিবন্ধনে বাবা-মায়ের নামের বানান এনআইডি থেকে আলাদা থাকে, আর সেটাই শিশুদের আবেদন আটকে যাওয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ। এমন অমিল থাকলে পাসপোর্টের আবেদনের আগেই জন্ম নিবন্ধন সংশোধন করে নেওয়া সঠিক পথ। প্রিন্ট কপির ক্ষেত্রে বারকোড অংশটি স্পষ্ট ও অস্পষ্টতাহীন হতে হবে — ঝাপসা প্রিন্ট স্ক্যানে পড়া যায় না, ফলে আবার প্রিন্ট করতে হতে পারে। বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে প্রতিটি প্রিন্ট একবার চোখ বুলিয়ে নিন।
জন্ম নিবন্ধন অনলাইনে আছে কিনা যেভাবে নিশ্চিত হবেন
শিশুর আবেদনের আগে জন্ম নিবন্ধনটি সত্যিই অনলাইন ডাটাবেসে আছে কিনা যাচাই করে নেওয়া সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ, কারণ কাগজের সনদ হাতে থাকলেও অনেক পুরনো নিবন্ধন অনলাইন সিস্টেমে ওঠেনি। যাচাই করা যায় জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধনের অফিসিয়াল যাচাই সেবায় নিবন্ধন নম্বর ও জন্মতারিখ দিয়ে — তথ্য মিলে গেলে সনদটি আবেদনের উপযোগী। যাচাইয়ে তথ্য না পেলে আবেদনের আগে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশনের নিবন্ধন কার্যালয়ে গিয়ে নিবন্ধনটি অনলাইন করে নিতে হবে। এই ধাপটি পাসপোর্ট অফিসের কাজ নয়, তাই শিশুর পাসপোর্টের পরিকল্পনায় এই সময়টুকু আগেই ধরে রাখুন। যাচাইয়ের ধাপ ও অনলাইন কপি পাওয়ার নিয়ম বিস্তারিত আছে জন্ম নিবন্ধন অনলাইন কপির লেখায়।
প্রাপ্তবয়স্ক কিন্তু এনআইডি এখনো হয়নি — তাঁদের পথ
বয়স ১৮ পেরিয়ে গেছে অথচ কখনো ভোটার নিবন্ধন বা এনআইডি করা হয়নি — এমন আবেদনকারীর সংখ্যা কম নয়। তাঁদের ক্ষেত্রে পাসপোর্টের আবেদন শুরুর আগে এনআইডি করাটাই প্রথম কাজ; এনআইডি ছাড়া প্রাপ্তবয়স্কের পাসপোর্ট আবেদনের বিকল্প পথ কার্যত নেই (১৮–২০ বছর বয়সীদের জন্ম নিবন্ধনের সুযোগটি আগের অংশে বলা হয়েছে)। এনআইডির প্রক্রিয়ায় কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে, তাই বিদেশ যাত্রা বা ভর্তির সময়সূচি থাকলে এই ক্রমটি হাতে সময় রেখে শুরু করুন — পাসপোর্টের আবেদন তাড়াহুড়ো করে করা গেলেও এনআইডির ধাপটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। গোটা পরিকল্পনাটি তাই দুই পর্বে ভাবুন: প্রথমে পরিচয় নথি ঠিক করা, তারপর পাসপোর্ট।
গ্যারান্টর বা রেফারেন্স ব্যক্তির তথ্য
অনলাইন ফরমে একজন পরিচিত ব্যক্তির তথ্য দিতে হয় — নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর ও সম্পর্ক। এই ব্যক্তির কোনো কাগজপত্র জমা দিতে হয় না, তবে তথ্যগুলো সঠিক ও যাচাইযোগ্য হতে হবে। আবেদন শুরুর আগেই এমন একজনের তথ্য গুছিয়ে রাখুন, যাতে ফরমের মাঝখানে এসে খুঁজতে না হয়। আত্মীয়, সহকর্মী বা পরিচিত যেকোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিই হতে পারেন; শর্ত একটাই — তথ্য যেন বাস্তব হয়। ফরমের অন্যান্য ঘরের মতো এখানেও অনুমানের জায়গা নেই।
ফটোকপি ও প্রিন্টের ব্যবহারিক নির্দেশনা
ছোট্ট এই প্রস্তুতিটি অফিসে সময় বাঁচায়। প্রতিটি মূল কাগজের অন্তত এক সেট পরিষ্কার ফটোকপি সঙ্গে রাখুন — অফিসের পাশের দোকানে ভিড়ের মধ্যে ফটোকপি করতে গিয়ে অনেকের অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় পার হয়ে যায়। অনলাইন আবেদনপত্রের প্রিন্ট নিন A4 কাগজে, যাতে বারকোডের অংশটি সম্পূর্ণ ও স্পষ্ট থাকে; বারকোড কেটে গেলে বা ঝাপসা হলে স্ক্যানারে পড়া যায় না। ফি-র রশিদ বা চালানের কপিও একই ফাইলে রাখুন। সব কাগজ একটি স্বচ্ছ ফোল্ডারে ক্রমানুসারে সাজিয়ে নিলে যাচাইয়ের সময় কর্মকর্তার কাজও সহজ হয়, আপনার অপেক্ষাও কমে — এই সাধারণ শৃঙ্খলাটুকুই ব্যস্ত অফিসে বড় পার্থক্য গড়ে দেয়।
অফিসে রওনা হওয়ার আগে শেষ যাচাই
সবশেষে একটি দুই মিনিটের অভ্যাস: বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে প্রতিটি মূল কাগজ হাতে ধরে নাম ও জন্মতারিখের বানান একবার করে পড়ে দেখুন। শুনতে তুচ্ছ মনে হলেও, অফিসে আটকে যাওয়া আবেদনগুলোর বড় অংশের কারণ এই মিলিয়ে-না-দেখাই। বিশেষ করে বাবা-মায়ের নামের বানান (নিজের এনআইডি বনাম তাঁদের এনআইডি), শিশুর জন্ম নিবন্ধনে বাবা-মায়ের নাম এবং পুরনো পাসপোর্টের ডেটা পেজের তথ্য — এই তিন জায়গায় অমিল লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। অমিল আগেই ধরা পড়লে বাড়ি বসেই সমাধানের পথ খোঁজা যায়; অফিসে ধরা পড়লে দিনটাই নষ্ট হয়।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
ই-পাসপোর্ট করতে সবচেয়ে জরুরি কাগজ কোনটি?
প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এনআইডি, ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ। এই একটি নথির তথ্যের ভিত্তিতেই পুরো আবেদন যাচাই হয়।
এনআইডি না থাকলে পাসপোর্ট করা যাবে কি?
প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এনআইডি ছাড়া আবেদন করা যায় না বললেই চলে। আগে এনআইডি করে নিন, তারপর পাসপোর্টের আবেদন করুন।
জন্ম নিবন্ধন সনদ হাতে লেখা হলে চলবে কি?
না। অনলাইনে যাচাইযোগ্য (১৭ ডিজিটের) জন্ম নিবন্ধন সনদ লাগবে। পুরনো সনদ অনলাইন না থাকলে আগে সেটি অনলাইন করে নিন — নিয়ম জানতে পড়ুন জন্ম নিবন্ধন অনলাইন কপির লেখাটি।
ছবি কি নিজে তুলে নিয়ে যেতে হবে?
প্রাপ্তবয়স্ক ও বড় শিশুদের ছবি অফিসেই তোলা হয়। শুধু ৬ বছরের কম বয়সীদের ক্ষেত্রে ল্যাব-প্রিন্ট 3R ছবি সঙ্গে নিতে হয়।
কাগজপত্র কি সত্যায়িত করতে হবে?
না। অনলাইন আবেদনে সত্যায়নের প্রয়োজন নেই; অফিসে মূল কপি দেখালেই চলে।
সরকারি চাকরিজীবীর জন্য বাড়তি কী লাগে?
দপ্তরের অনাপত্তিপত্র (NOC) বা সরকারি আদেশ (GO) লাগতে পারে — আবেদনের আগেই দপ্তর থেকে সংগ্রহ করে রাখুন।
বাবা-মায়ের এনআইডি কখন লাগে?
আবেদনকারী ১৮ বছরের কম বয়সী হলেই দুজনের এনআইডির কপি লাগে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে লাগে না।
এনআইডির অনলাইন কপি দিয়ে কি আবেদন করা যাবে?
যাবে। স্মার্ট কার্ড হাতে না থাকলে এনআইডির অনলাইন কপি দিয়ে আবেদন করা যায়; অফিসে যাওয়ার সময় সেটির প্রিন্ট ও সম্ভব হলে মূল নথি সঙ্গে রাখুন।
পাসপোর্টের ছবির জন্য কি ড্রেস কোড আছে?
আলাদা কোনো কঠোর ড্রেস কোড নেই; মার্জিত পোশাকই যথেষ্ট। ছবি অফিসে তোলা হয় বলে মুখ স্পষ্ট দেখা যায় এমনভাবে উপস্থিত হওয়াই মূল বিষয়।
দ্বিতীয়বার অফিসে যাওয়ার সময়ও কি সব কাগজ লাগবে?
ডেলিভারির দিন সাধারণত শুধু ডেলিভারি স্লিপ ও এনআইডি লাগে। তবে আগের পাসপোর্ট থাকলে সেটিও সঙ্গে রাখুন।
বাবা-মা দুজনেই বিদেশে থাকলে শিশুর পাসপোর্ট হবে কীভাবে?
দেশে থাকা আইনি অভিভাবকের মাধ্যমে আবেদনের সুযোগ থাকে; এক্ষেত্রে অভিভাবকত্বের প্রমাণপত্র লাগতে পারে। সুনির্দিষ্ট তালিকার জন্য সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসে আগে জেনে নিন।
এনআইডির ছবি অনেক পুরনো হলে কি সমস্যা হবে?
ছবি পুরনো হলেও এনআইডির তথ্যগত মিলই মূল বিষয়। বায়োমেট্রিকে নতুন ছবি তোলা হয়, তাই পুরনো এনআইডি ছবি নিয়ে পাসপোর্ট আটকায় না।
ঠিকানার প্রমাণ হিসেবে কত পুরনো বিল চলবে?
সাম্প্রতিক মাসের বিলই গ্রহণযোগ্য ধরা হয় — সাধারণত সর্বশেষ পরিশোধিত বিলের কপি সঙ্গে রাখুন। অনেক পুরনো বিলে বর্তমান বসবাস প্রমাণ হয় না।
অন্যের হয়ে কাগজপত্র জমা দেওয়া যাবে কি?
বায়োমেট্রিক আবেদনকারীকেই দিতে হয় — ছবি ও আঙুলের ছাপ অন্যে দিতে পারে না। তবে তথ্য জানতে বা ফরম পূরণে পরিবারের সদস্য সাহায্য করতে পারেন।



মন্তব্য
মন্তব্য লোড হচ্ছে…
মন্তব্য করতে আপনার Gmail ঠিকানা দিন — ইমেইলে একবার ব্যবহারের সাইন-ইন লিংক যাবে, তাতে ক্লিক করলেই যাচাই হয়ে যাবে। পাসওয়ার্ড লাগবে না।