ই-পাসপোর্টের ফি নিয়ে খুঁজতে গেলেই বিভ্রান্তি। এক সাইটে ৪৮ পৃষ্ঠার ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের সুপার এক্সপ্রেস ফি লেখা ১০,৩৫০ টাকা, আরেক সাইটে ১০,৮০০ টাকা; কোথাও আবার শুধু মূল ফি লিখে ভ্যাটের কথা উল্লেখই নেই। অথচ সরকারি ফি একটি নির্দিষ্ট তালিকা অনুযায়ী ঠিক করা — পৃষ্ঠা, মেয়াদ আর ডেলিভারির ধরন মিলিয়ে মোট বারোটি সংমিশ্রণ, প্রতিটির অঙ্ক নির্দিষ্ট। এই লেখায় ই-পাসপোর্ট পোর্টালের সরকারি তালিকা অনুযায়ী ভ্যাটসহ পূর্ণ চার্ট, মূল ফি থেকে ভ্যাটসহ অঙ্ক বের হওয়ার হিসাব এবং ফি জমা দেওয়ার সঠিক নিয়ম দেওয়া হলো, যাতে পেমেন্টের সময় এক টাকাও অনুমানে না দিতে হয়।
এই লেখায় যা যা আছে
- ফি নির্ধারণ হয় কোন তিনটি বিষয়ে
- ভ্যাটসহ পূর্ণ ফি-র চার্ট ও ডেলিভারির সময়
- মূল ফি ও ভ্যাটের হিসাব — ভিন্ন সাইটে ভিন্ন সংখ্যা কেন
- কোন বইটি বেছে নেবেন — ৪৮ না ৬৪ পৃষ্ঠা, ৫ না ১০ বছর
- ফি জমা দেওয়ার নিয়ম — অনলাইন ও এ-চালান
- ফি দেওয়ার সময় যেসব ভুলে টাকা আটকে যায়
- ভুল অঙ্ক বা ভুল নামে ফি দিলে করণীয়
- E-Passport fee summary in English
- সচরাচর জিজ্ঞাসা
ফি নির্ধারণ হয় তিনটি বিষয়ে
প্রথম বিষয় পাসপোর্ট বইয়ের পৃষ্ঠা সংখ্যা — ৪৮ পৃষ্ঠা অথবা ৬৪ পৃষ্ঠা। দ্বিতীয় বিষয় মেয়াদ — ৫ বছর অথবা ১০ বছর। তৃতীয় বিষয় ডেলিভারির ধরন — রেগুলার, এক্সপ্রেস অথবা সুপার এক্সপ্রেস, অর্থাৎ কত দ্রুত পাসপোর্ট হাতে পেতে চান। এই তিনটি পছন্দের সংমিশ্রণেই ফি ঠিক হয়; আবেদনকারীর বয়স বা পেশা অনুযায়ী দেশের ভেতরে ফি বদলায় না। একটি সীমাবদ্ধতা মনে রাখা দরকার: ১৮ বছরের কম বয়সীদের জন্য শুধু ৪৮ পৃষ্ঠার ৫ বছর মেয়াদি বই পাওয়া যায়, তাই শিশুদের ক্ষেত্রে পছন্দের সুযোগ একটিই।
ভ্যাটসহ পূর্ণ ফি-র চার্ট
নিচের সব অঙ্কে ১৫% ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত — পেমেন্টের সময় ঠিক এই পরিমাণই দিতে হবে।
| পাসপোর্ট বই | মেয়াদ | রেগুলার | এক্সপ্রেস | সুপার এক্সপ্রেস |
|---|---|---|---|---|
| ৪৮ পৃষ্ঠা | ৫ বছর | ৪,০২৫ টাকা | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,৬২৫ টাকা |
| ৪৮ পৃষ্ঠা | ১০ বছর | ৫,৭৫০ টাকা | ৮,০৫০ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা |
| ৬৪ পৃষ্ঠা | ৫ বছর | ৬,৩২৫ টাকা | ৮,৬২৫ টাকা | ১২,০৭৫ টাকা |
| ৬৪ পৃষ্ঠা | ১০ বছর | ৮,০৫০ টাকা | ১০,৩৫০ টাকা | ১৩,৮০০ টাকা |
ডেলিভারির নির্ধারিত সময় কার্যদিবস হিসেবে: রেগুলারে ২১ কার্যদিবস, এক্সপ্রেসে ১০ কার্যদিবস, সুপার এক্সপ্রেসে ২ কার্যদিবস। বাস্তবে অফিসের চাপ অনুযায়ী সময় কিছুটা কম-বেশি হতে পারে, আর সুপার এক্সপ্রেস সুবিধা সব আঞ্চলিক অফিসে সমানভাবে পাওয়া যায় না — জরুরি প্রয়োজনে আবেদনের আগেই নিজের অফিসে খোঁজ নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ। নবায়ন বা রি-ইস্যুর ক্ষেত্রেও ঠিক এই চার্টই প্রযোজ্য; আলাদা কোনো নবায়ন ফি নেই। পাসপোর্ট নবায়নের পুরো প্রক্রিয়া আলাদা লেখায় দেওয়া আছে।
মূল ফি ও ভ্যাটের হিসাব — ভিন্ন সাইটে ভিন্ন সংখ্যা কেন
বিভ্রান্তির মূল কারণ এখানেই। সরকারি মূল ফি-র ওপর ১৫% ভ্যাট যোগ হয়ে চূড়ান্ত অঙ্ক তৈরি হয়। যেমন ৪৮ পৃষ্ঠা ৫ বছর মেয়াদি রেগুলার ডেলিভারির মূল ফি ৩,৫০০ টাকা; তার ওপর ভ্যাট ৫২৫ টাকা — মোট ৪,০২৫ টাকা। যেসব সাইটে ৩,৫০০ টাকা লেখা দেখেন, তারা মূল ফি উল্লেখ করেছে, কিন্তু পেমেন্ট গেটওয়েতে আপনাকে দিতে হবে ভ্যাটসহ ৪,০২৫ টাকাই। একইভাবে ৪৮ পৃষ্ঠা ১০ বছরের মূল ফি ৫,০০০ / ৭,০০০ / ৯,০০০ টাকা, ভ্যাটসহ যা দাঁড়ায় ৫,৭৫০ / ৮,০৫০ / ১০,৩৫০ টাকা। তাই কোনো সাইটের সংখ্যা চার্টের সঙ্গে না মিললে আগে দেখুন সেটি ভ্যাট ছাড়া মূল ফি কিনা; মিল না হলে সেই সংখ্যার ওপর ভরসা না করাই ভালো।
কোন বইটি বেছে নেবেন — ৪৮ না ৬৪ পৃষ্ঠা, ৫ না ১০ বছর
বেশিরভাগ আবেদনকারীর জন্য সবচেয়ে যুক্তিসংগত পছন্দ ৪৮ পৃষ্ঠা, ১০ বছর মেয়াদ। কারণ পৃষ্ঠা ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই সাধারণ ভ্রমণকারীর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়, আর ৫ বছরের বই দুবার করলে মোট খরচ ১০ বছরের একটি বইয়ের চেয়ে বেশি পড়ে — একই সঙ্গে দুবার আবেদনের ঝামেলাও থাকে। ৬৪ পৃষ্ঠার বই তাদের জন্যই অর্থবহ, যারা পেশাগত কারণে বছরে অনেকবার বিদেশ যান এবং ভিসা ও সিলে দ্রুত পৃষ্ঠা ভরে যায় — যেমন ব্যবসায়ী, এয়ারলাইন বা শিপিং পেশার মানুষ, প্রবাসী কর্মী। ডেলিভারির ধরন বাছুন হাতে থাকা সময় দেখে: হাতে তিন সপ্তাহের বেশি সময় থাকলে রেগুলারই যথেষ্ট; ভিসার ইন্টারভিউ বা যাত্রার তারিখ ঘনিয়ে এলে তবেই এক্সপ্রেস বা সুপার এক্সপ্রেসের বাড়তি খরচ যুক্তিযুক্ত।
ফি জমা দেওয়ার নিয়ম — ধাপে ধাপে
ফি দুইভাবে জমা দেওয়া যায়। অনলাইন আবেদনের পর পোর্টাল থেকেই যে পদ্ধতিটি বেছে নেবেন, তার ধাপগুলো এমন:
- অনলাইন পেমেন্ট: পোর্টালের Payment ধাপে গিয়ে পৃষ্ঠা, মেয়াদ ও ডেলিভারির ধরন মিলিয়ে দেখুন — অঙ্কটি চার্টের সঙ্গে মিললেই এগিয়ে যান। বিকাশ, নগদ, রকেট, কার্ড বা ইন্টারনেট ব্যাংকিংয়ের যেকোনো মাধ্যমে পরিশোধ করা যায়। পেমেন্ট শেষে পোর্টালে Payment Verify করে রিসিপ্ট ডাউনলোড করে রাখুন।
- অফলাইন (এ-চালান): পেমেন্ট অপশনে Offline বেছে নিলে চালানের তথ্য পাওয়া যাবে। নির্ধারিত ব্যাংকে (সোনালী ব্যাংকসহ তফসিলি ব্যাংকগুলোতে) এ-চালানের মাধ্যমে অঙ্কটি জমা দিয়ে চালানের কপি সংগ্রহ করুন। চালানে নাম ও আবেদনের তথ্য হুবহু মিলিয়ে লিখুন।
দুই ক্ষেত্রেই রশিদ বা চালান ডেলিভারির দিন পর্যন্ত যত্নে রাখতে হয় — বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্টের সময় এটি দেখাতে হয়। ফি ছাড়া আবেদনের বাকি ধাপগুলো জানতে পড়ুন ই-পাসপোর্ট করার নিয়ম নির্দেশিকাটি।
ফি দেওয়ার সময় যেসব ভুলে টাকা আটকে যায়
সবচেয়ে সাধারণ ভুল হলো পেমেন্টের সময় পৃষ্ঠা সংখ্যা বা ডেলিভারির ধরন ভুল নির্বাচন করা — আবেদনে ৪৮ পৃষ্ঠা বেছে পেমেন্টে ৬৪ পৃষ্ঠার অঙ্ক দিয়ে ফেললে দুটি মিলবে না এবং আবেদন আটকে থাকে। দ্বিতীয় ভুল, অন্যের আবেদনের রেফারেন্সে বা ভুল নামে পেমেন্ট করা। তৃতীয় ভুল, রিসিপ্ট ডাউনলোড না করে পেজ বন্ধ করে দেওয়া — পরে পেমেন্ট প্রমাণ করতে গিয়ে ভোগান্তি হয়। পেমেন্টের প্রতিটি পর্দায় নাম, আবেদন নম্বর ও অঙ্ক — এই তিনটি মিলিয়ে দেখার অভ্যাসই এসব ভুল থেকে বাঁচায়। কোন কাগজপত্রের সঙ্গে রশিদটি নিয়ে অফিসে যেতে হবে, তার তালিকা আছে কাগজপত্রের লেখায়।
ভুল অঙ্ক বা ভুল নামে ফি দিলে করণীয়
ভুল হয়ে গেলে দালালের কাছে যাওয়ার কোনো কারণ নেই — বিষয়টি পাসপোর্ট অফিসই দেখে। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী, ভুল নামে ফি জমা পড়লেও সংশ্লিষ্ট পাসপোর্ট অফিসে আবেদন ও প্রমাণসহ যোগাযোগ করলে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে পারে; এক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়পত্রের প্রয়োজন হতে পারে এবং স্বাভাবিকের চেয়ে সময় বেশি লাগতে পারে। ভুল অঙ্কের ক্ষেত্রেও প্রথম ঠিকানা পাসপোর্ট অফিসের হেল্প ডেস্ক। একটি বাস্তব কথা মনে রাখা ভালো: সরকারি ফি সাধারণত ফেরত দেওয়ার নিয়ম নেই, তাই ভুল শুধরানোর পথ থাকলেও সঠিক অঙ্ক একবারে দেওয়াই একমাত্র ঝামেলাহীন পথ।
E-Passport fee summary in English
Bangladesh e-passport fees (including 15% VAT) depend on booklet size, validity and delivery speed. A 48-page passport costs BDT 4,025 (regular), 6,325 (express) or 8,625 (super express) for 5-year validity, and BDT 5,750 / 8,050 / 10,350 for 10-year validity. A 64-page passport costs BDT 6,325 / 8,625 / 12,075 for 5 years and BDT 8,050 / 10,350 / 13,800 for 10 years. Fees can be paid online through the e-passport portal (bKash, Nagad, Rocket, cards, internet banking) or offline through an A-Challan at a scheduled bank. The same fee chart applies to renewals and re-issues.
কোন ডেলিভারি ধরন কখন যুক্তিযুক্ত
ডেলিভারির ধরন বাছাই আসলে সময়ের হিসাব। হাতে এক মাসের বেশি সময় থাকলে রেগুলার ডেলিভারিই যথেষ্ট — বাড়তি টাকা খরচের কারণ নেই। ভিসা আবেদনের তারিখ বা ভর্তির সেশন শুরু হতে দুই-তিন সপ্তাহ বাকি থাকলে এক্সপ্রেস মাঝামাঝি নিরাপদ পছন্দ। সুপার এক্সপ্রেস তখনই অর্থবহ, যখন সত্যিকারের জরুরি পরিস্থিতি — হঠাৎ চিকিৎসা, জরুরি অফিসিয়াল সফর বা কাছাকাছি যাত্রার তারিখ। মনে রাখতে হবে, নির্ধারিত সময় কার্যদিবসে গণনা হয়; শুক্র-শনিবার ও সরকারি ছুটি এই হিসাবের বাইরে থাকে। হজ বা ভর্তির মৌসুমের মতো চাপের সময়ে আবেদন জমা বেশি পড়ে, তখন নির্ধারিত সময়ের পরেও কয়েকদিন লেগে যেতে পারে — পরিকল্পনায় সেই ছাড় রাখুন।
সরকারি ফি-র বাইরে আর কোনো খরচ আছে কি
সরকারি ফি-ই মূল ও প্রায় একমাত্র খরচ। এর বাইরে ছোটখাটো আনুষঙ্গিক খরচ হতে পারে: ৬ বছরের কম বয়সী শিশুর ল্যাব-প্রিন্ট ছবি, ফটোকপি ও প্রিন্ট, অফিসে যাতায়াত। কোনো এজেন্ট বা দালালকে দেওয়া অর্থ সরকারি খরচ নয় — প্রক্রিয়াটি নিজে করার মতো করে সাজানো, মাঝখানে কারো "সার্ভিস চার্জ" দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। পেমেন্টের সময় গেটওয়ে মাধ্যমভেদে সামান্য লেনদেন চার্জ প্রযোজ্য হতে পারে, তবে তা মূল ফি-র অংশ নয়। মোট বাজেট ধরে রাখার সময় তাই চার্টের অঙ্কের সঙ্গে এই ছোট খরচগুলো যোগ করলেই পূর্ণ ছবি পাওয়া যায়।
প্রবাসীদের ফি আলাদা
বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলোতে ফি টাকায় নয়, সংশ্লিষ্ট দেশের মুদ্রায় (ডলার, ইউরো ইত্যাদি) নির্ধারিত হয় এবং দেশভেদে অঙ্ক আলাদা। অনেক মিশনে শিক্ষার্থী ও শ্রমিকদের জন্য কম হারের বিশেষ তালিকাও থাকে। প্রবাসে আবেদন করলে এই লেখার চার্ট প্রযোজ্য নয় — সংশ্লিষ্ট দূতাবাসের ওয়েবসাইটে দেওয়া তালিকাই চূড়ান্ত। আবেদনের আগে মিশনের সাইট থেকে ফি ও পেমেন্টের মাধ্যম (সাধারণত ব্যাংক ট্রান্সফার) জেনে নিন, কারণ মিশনগুলোতে নগদ অর্থ গ্রহণ করা হয় না বললেই চলে।
একটি পরিবারের মোট খরচের উদাহরণ
হিসাবটি বাস্তবে কেমন দাঁড়ায়, একটি উদাহরণে দেখা যাক। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ৪৮ পৃষ্ঠা ১০ বছর মেয়াদি রেগুলার ডেলিভারি নিলে প্রতিজনের ফি ৫,৭৫০ টাকা করে মোট ১১,৫০০ টাকা। সঙ্গে পাঁচ বছরের কম বয়সী সন্তানের জন্য ৪৮ পৃষ্ঠা ৫ বছর মেয়াদি রেগুলারে আরও ৪,০২৫ টাকা — পরিবারের মোট সরকারি ফি ১৫,৫২৫ টাকা। একই পরিবার যদি সবার জন্য এক্সপ্রেস ডেলিভারি বেছে নেয়, হিসাব দাঁড়ায় ৮,০৫০ × ২ + ৬,৩২৫ = ২২,৪২৫ টাকা। অর্থাৎ ডেলিভারির ধরনের সিদ্ধান্তেই প্রায় সাত হাজার টাকার পার্থক্য — হাতে সময় থাকলে রেগুলার বেছে নেওয়ার আর্থিক যুক্তি এখানেই। নিজের পরিবারের হিসাবটি চার্ট থেকে এভাবেই বের করে নেওয়া যায়।
পেমেন্ট যাচাই ও রশিদ সংরক্ষণ
অনলাইন পেমেন্ট সম্পন্ন হলেই কাজ শেষ নয় — পোর্টালে ফিরে গিয়ে Payment Verify ধাপটি সম্পন্ন করুন, যাতে পেমেন্টটি আপনার আবেদনের সঙ্গে যুক্ত হয়। ভেরিফাই না হলে বায়োমেট্রিকের তারিখ নির্বাচন আটকে থাকতে পারে। রিসিপ্টে থাকা লেনদেন নম্বরটি পাসপোর্ট হাতে পাওয়া পর্যন্ত সংরক্ষণ করুন; কোনো জটিলতায় অফিসে গেলে এই নম্বর দিয়েই পেমেন্ট খুঁজে বের করা হয়। এ-চালানের ক্ষেত্রে ব্যাংকের সিল দেওয়া কপিটিই প্রমাণ — তার ছবি মোবাইলে তুলে রাখুন, কারণ কাগজের রশিদ হারিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। একই আবেদনের জন্য ভুল করে দুবার পেমেন্ট হয়ে গেলে দ্বিতীয় লেনদেনের রশিদসহ পাসপোর্ট অফিসে যোগাযোগ করুন; বিষয়টি নিষ্পত্তির পথ অফিসই দেখিয়ে দেবে, কোনো তৃতীয় পক্ষের হাতে টাকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই।
ফি-সংক্রান্ত প্রতারণা থেকে সাবধান
পাসপোর্ট ফি শুধু দুটি মাধ্যমেই জমা হয়: অফিসিয়াল পোর্টালের (epassport.gov.bd) পেমেন্ট গেটওয়ে অথবা ব্যাংকের এ-চালান। এর বাইরে কেউ যদি "ফি জমা করে দেব" বলে ব্যক্তিগত বিকাশ নম্বরে টাকা চায়, সেটি প্রতারণা। ভুয়া ওয়েবসাইটও এই ঝুঁকির অংশ — সার্চে আসা যেকোনো লিংকে ঢোকার আগে ঠিকানাটি সরকারি ডোমেইনের কিনা মিলিয়ে নিন। মনে রাখুন, সরকারি ফি-র পরিমাণ নির্দিষ্ট এবং সবার জন্য একই; কেউ কম টাকায় দ্রুত পাসপোর্টের প্রতিশ্রুতি দিলে সেটি বিশ্বাস করার কোনো ভিত্তি নেই।
৪৮ পৃষ্ঠা কতদিন চলবে — পৃষ্ঠা খরচের ধারণা
বই বাছাইয়ে সাহায্য করতে পৃষ্ঠা খরচের একটি মোটামুটি ধারণা কাজে লাগে। একটি দেশে একবার ভ্রমণে সাধারণত ভিসার জন্য একটি পূর্ণ পৃষ্ঠা এবং আগমন-বহির্গমনের সিলের জন্য আংশিক পৃষ্ঠা খরচ হয়; যেসব দেশে ভিসা-অন-অ্যারাইভাল বা ই-ভিসা, সেখানে খরচ আরও কম। বছরে দুই-তিনবার ভ্রমণ করেন এমন একজন সাধারণ যাত্রীর ক্ষেত্রে ৪৮ পৃষ্ঠার বই স্বাভাবিকভাবে ১০ বছরের মেয়াদ জুড়েই চলে যায়। বছরে ছয়-সাতবারের বেশি ভ্রমণ হলে বা বড় আকারের একাধিক দীর্ঘমেয়াদি ভিসা থাকলে হিসাব বদলায় — তখনই ৬৪ পৃষ্ঠার বই যুক্তিসংগত হয়। এটি একটি আনুমানিক ধারণা; নিজের গত দুই বছরের ভ্রমণসংখ্যা গুনে নিলেই নিজের জন্য সঠিক হিসাবটি পেয়ে যাবেন।
ছাত্র হিসেবে বিদেশে ভর্তির ক্ষেত্রে বাজেট পরিকল্পনা
বিদেশে ভর্তির প্রস্তুতিতে পাসপোর্টের সময় ও খরচ প্রায়ই শেষ মুহূর্তে এসে চাপ তৈরি করে। বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা হলো: সেশনের অন্তত তিন মাস আগে পাসপোর্টের আবেদন শুরু করা, যাতে রেগুলার ডেলিভারিতেই কাজ শেষ হয় এবং এক্সপ্রেসের বাড়তি খরচ না লাগে। ভিসা আবেদনের সময় পাসপোর্টের মেয়াদ সাধারণত পুরো কোর্সের সময়কাল কভার করা উচিত — এই কারণেই ছাত্রদের জন্য ১০ বছর মেয়াদি বই সবচেয়ে সাশ্রয়ী পছন্দ; ৫ বছরের বই নিলে কোর্সের মাঝপথে বিদেশে বসে নবায়নের ঝামেলা ও মিশনের বেশি ফি দুটোই আসতে পারে। একবারের সিদ্ধান্তে এই দীর্ঘমেয়াদি হিসাবটি মাথায় রাখলে পরের বছরগুলোতে অর্থ ও সময় দুটোই বাঁচে।
বছরের হিসাবে কোন মেয়াদ সাশ্রয়ী
ফি-র তুলনা শুধু এককালীন অঙ্কে নয়, বছরের হিসাবে করলেই আসল চিত্র পাওয়া যায়। ৪৮ পৃষ্ঠা রেগুলার ডেলিভারিতে ৫ বছর মেয়াদি বইয়ের খরচ ৪,০২৫ টাকা — বছরে গড়ে ৮০৫ টাকা। একই বই ১০ বছর মেয়াদে ৫,৭৫০ টাকা — বছরে গড়ে মাত্র ৫৭৫ টাকা। অর্থাৎ ১০ বছরের বই নিলে বছরে প্রায় ২৩০ টাকা সাশ্রয়, দুই দশকে যা দাঁড়ায় একটি পুরো বইয়ের দামের কাছাকাছি। এর ওপর ৫ বছরের বই দুবার করতে গেলে দ্বিতীয়বার আবেদনের সময়, অফিসে যাতায়াত ও নবায়নের ঝামেলাও যোগ হয়। ব্যতিক্রম শুধু শিশুরা — তাদের জন্য ৫ বছরের বই-ই একমাত্র বিকল্প। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে তাই মেয়াদের সিদ্ধান্তটি প্রায় সবসময়ই ১০ বছরের পক্ষে যায়।
পেমেন্ট মাধ্যম অনুযায়ী সুবিধা-অসুবিধা
অনলাইন পেমেন্টের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো তাৎক্ষণিক যাচাই — পেমেন্ট সফল হলেই পোর্টালে তা প্রতিফলিত হয় এবং পরের ধাপে এগিয়ে যাওয়া যায়। মোবাইল ব্যাংকিংয়ে অঙ্কের সীমা নিয়ে সাধারণত সমস্যা হয় না, তবে কার্ডে পরিশোধের ক্ষেত্রে নিজের দৈনিক লেনদেন সীমার কথা মাথায় রাখুন — বড় অঙ্কের ফি দিতে গিয়ে সীমা অতিক্রম হলে লেনদেন ব্যর্থ হতে পারে। এ-চালানের সুবিধা হলো ব্যাংকের সিলযুক্ত বাস্তব রশিদ হাতে থাকে; অসুবিধা হলো ব্যাংকে যাওয়ার সময় ও চালানে তথ্য লেখার সময় ভুলের ঝুঁকি — নামের বানান বা আবেদন নম্বরে একটি অক্ষরের ভুলও যাচাইয়ে জটিলতা তৈরি করে। যে মাধ্যমই বেছে নিন, লেনদেন শেষে প্রমাণটি (রিসিপ্ট, চালান বা স্ক্রিনশট) সংরক্ষণ করাই মূল নিয়ম।
পেমেন্টের অঙ্ক মেলানোর সহজ কৌশল
পেমেন্টের পর্দায় অঙ্ক দেখলেই একটি দ্রুত যাচাই করে নিন: আপনার বই (পৃষ্ঠা ও মেয়াদ) এবং ডেলিভারির ধরন — এই তিনটি এই লেখার চার্টের কোন ঘরে পড়ে, এবং সেখানকার অঙ্কের সঙ্গে পর্দার অঙ্ক মিলছে কিনা। অমিল মানেই কোথাও ভুল অপশন নির্বাচিত হয়েছে — পেমেন্ট না করে আগের ধাপে ফিরে যান। এই দশ সেকেন্ডের যাচাই ভুল ফি জমা দেওয়ার প্রায় সব ঘটনাই ঠেকিয়ে দেয়, কারণ ভুলগুলো প্রায় সবসময়ই অঙ্কে নয়, অপশন নির্বাচনে হয়ে থাকে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা
ই-পাসপোর্ট করতে সবচেয়ে কম খরচ কত?
৪৮ পৃষ্ঠা, ৫ বছর মেয়াদ, রেগুলার ডেলিভারি — ভ্যাটসহ ৪,০২৫ টাকা। এটাই সর্বনিম্ন সরকারি ফি।
৪৮ পৃষ্ঠা ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্টের ফি কত?
রেগুলার ৫,৭৫০ টাকা, এক্সপ্রেস ৮,০৫০ টাকা, সুপার এক্সপ্রেস ১০,৩৫০ টাকা (ভ্যাটসহ)।
ফি কি বিকাশে দেওয়া যায়?
হ্যাঁ। পোর্টালের অনলাইন পেমেন্টে বিকাশ, নগদ, রকেট, কার্ড ও ইন্টারনেট ব্যাংকিং — সব মাধ্যমই চালু আছে। চাইলে এ-চালানে ব্যাংকেও জমা দেওয়া যায়।
নবায়নের ফি কি নতুন পাসপোর্টের চেয়ে কম?
না। নবায়ন বা রি-ইস্যুতে একই চার্ট প্রযোজ্য — বেছে নেওয়া বই ও ডেলিভারির ধরন অনুযায়ী একই অঙ্ক দিতে হয়। তথ্য সংশোধনের জন্য রি-ইস্যু করলেও তাই; বিস্তারিত পাসপোর্ট তথ্য সংশোধনের লেখায়।
শিশুদের পাসপোর্ট ফি কত?
শিশুদের জন্য শুধু ৪৮ পৃষ্ঠা ৫ বছর মেয়াদি বই হয় — রেগুলারে ৪,০২৫ টাকা থেকে শুরু (ভ্যাটসহ)।
কোনো সাইটে ফি কম দেখাচ্ছে কেন?
সম্ভবত সেখানে ভ্যাট ছাড়া মূল ফি লেখা আছে, অথবা পুরনো তালিকা রয়ে গেছে। পেমেন্টের সময় ভ্যাটসহ চূড়ান্ত অঙ্কই দিতে হয় — এই লেখার চার্টের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
ফি দেওয়ার পর আবেদন বাতিল করলে টাকা ফেরত পাবো কি?
সরকারি ফি সাধারণত ফেরতযোগ্য নয়। আবেদন বাতিলের প্রয়োজন হলে আগে পাসপোর্ট অফিসে কথা বলে নিন।
সুপার এক্সপ্রেসে কি সত্যিই ২ দিনে পাসপোর্ট পাওয়া যায়?
নির্ধারিত সময় ২ কার্যদিবস, তবে এই সুবিধা সব অফিসে সমানভাবে পাওয়া যায় না এবং যাচাইয়ে জটিলতা থাকলে সময় বাড়তে পারে। জরুরি প্রয়োজনে আগেই নিজের অফিসে নিশ্চিত হয়ে নিন।
ফি জমার রশিদ হারিয়ে গেলে কী হবে?
অনলাইন পেমেন্ট হলে পোর্টালে লগইন করে পেমেন্টের বিবরণ আবার দেখা বা প্রিন্ট করা যায়। এ-চালানের ক্ষেত্রে ব্যাংকের শাখায় অনুলিপির জন্য যোগাযোগ করতে হয়। তাই পেমেন্টের সঙ্গে সঙ্গে রিসিপ্টের ছবি তুলে রাখা ভালো অভ্যাস।
দুজনের (স্বামী-স্ত্রী বা পরিবার) আবেদনে কি ছাড় আছে?
না। প্রতিটি পাসপোর্টের ফি আলাদাভাবে, একই চার্ট অনুযায়ী দিতে হয় — পারিবারিক ছাড়ের কোনো ব্যবস্থা নেই।
ফি কি আংশিক বা কিস্তিতে দেওয়া যায়?
না। নির্ধারিত ফি একবারে, পূর্ণ অঙ্কে জমা দিতে হয় — আংশিক পেমেন্টে আবেদন এগোয় না।
৬৪ পৃষ্ঠার বইয়ের দাম বেশি কেন?
বইয়ের উৎপাদন খরচ ও ধারণক্ষমতা বেশি বলেই ফি বেশি। তবে বছরের হিসাবে ১০ বছর মেয়াদি ৬৪ পৃষ্ঠা (বছরে ৮০৫ টাকা) ৫ বছর মেয়াদি ৪৮ পৃষ্ঠার (বছরে ৮০৫ টাকা) সমানই পড়ে — ঘন ঘন ভ্রমণকারীর জন্য তাই এটি বাড়তি বোঝা নয়।
আবেদনের পর ফি-র তালিকা বদলে গেলে কোনটি প্রযোজ্য হবে?
সাধারণ নিয়মে পেমেন্টের সময়কার তালিকাই প্রযোজ্য হয়। আবেদন করে রেখে অনেকদিন পর ফি দিলে পেমেন্টের পর্দায় দেখানো হালনাগাদ অঙ্কই দিতে হতে পারে — পর্দার অঙ্ক চার্টের সঙ্গে মিলিয়ে নিন।
ছাত্রদের জন্য দেশে কি ফি কম?
দেশের ভেতরে ছাত্র ছাড়ের কোনো ব্যবস্থা নেই — সবার জন্য একই চার্ট। তবে বিদেশের কিছু মিশনে শিক্ষার্থীদের জন্য কম হারের আলাদা তালিকা থাকে।
পরিবারের সবার আবেদনে একসঙ্গে পেমেন্ট করা যায় কি?
প্রতিটি আবেদনের পেমেন্ট আলাদাভাবে করতে হয় — প্রতিটি আবেদনের রেফারেন্স আলাদা। একটি লেনদেনে অন্য আবেদনের ফি মেলানো যায় না।



মন্তব্য
মন্তব্য লোড হচ্ছে…
মন্তব্য করতে আপনার Gmail ঠিকানা দিন — ইমেইলে একবার ব্যবহারের সাইন-ইন লিংক যাবে, তাতে ক্লিক করলেই যাচাই হয়ে যাবে। পাসওয়ার্ড লাগবে না।